কে এই শাকের হোসাইন শিবলী? কী তাঁর পরিচয়? 'আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে " অমর গ্রন্থটির লেখক তিনি। এছাড়া মাওয়াজে ওলীপুরী জনপ্রিয় গ্রন্থটির তিনি সম্পাদক। আলেম মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি, এদেশে ইসলামপন্থীদের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের জন্য তিনি অমর হয়ে থাকবেন। সম্প্রতি ‘ফেতনায়ে মামুনিয়্যা’ বইটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। তাঁদের মধ্যে অন্যতম শাকের হোসাইন শিবলী, যিনি ‘শাহশী’ নামেও পরিচিত। ইসলামি সাংবাদিকতা, ইতিহাসভিত্তিক লেখালেখি ও প্রকাশনা জগতে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু কে এই শাকের হোসাইন শিবলী, কী তাঁর পরিচয় এবং লেখালেখির জগতে তাঁর কাজের ক্ষেত্রই বা কী?
শাকের হোসাইন শিবলীর পরিচয় কেবল একটি আলোচিত বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিকতা, ইসলামি ইতিহাসচর্চা, গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজের পরিচয় পাওয়া যায়। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাগত পথচলা প্রাপ্ত জীবনপরিচিতি অনুযায়ী, শাকের হোসাইন শিবলী ১৯৭৮ সালের ২৬ অক্টোবর চাঁদপুরের মুন্সিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামি ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখালেখির বিষয় নির্বাচনেও ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা যায়। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক যুগান্তরে কাজ করেন। এরপর ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে দৈনিক যুগান্তরের ইসলাম ও জীবন বিভাগের দায়িত্বও পালন করেন বলে তাঁর জীবনপরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিকতা পেশায় তাঁর এই অভিজ্ঞতা ইসলামি সমাজ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস ও সমকালীন নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে একটি পেশাগত ভিত্তি তৈরি করে। ইতিহাস ও আলেম-উলামাদের নিয়ে লেখালেখি শাকের হোসাইন শিবলীর লেখালেখির উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র ইসলামি ইতিহাস, ঐতিহ্য, আলেম-উলামাদের অবদান এবং সমকালীন সমাজ। এসব বিষয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘একাত্তরের চেপে রাখা ইতিহাস: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’, ‘একুশের মাওলানারা’ এবং ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’। বইগুলোর শিরোনাম থেকেই ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক বাস্তবতার বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁর আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে প্রতিটি গ্রন্থের বিষয়বস্তু, তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক বক্তব্যের মূল্যায়ন করতে হলে বইগুলো পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাময়িকী ও বই সম্পাদনার কাজেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। ফলে তাঁর পেশাগত পরিচয়ের একটি অংশ সাংবাদিকতা, অন্য অংশ গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনাকেন্দ্রিক। ‘ফেতনায়ে মামুনিয়্যা’ বইয়ে তাঁর ভূমিকা কী? সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ‘ফেতনায়ে মামুনিয়্যা ও মাওলানা আবদুল হক আজাদের সিংহ গর্জন’ বইটির প্রচ্ছদে শাকের হোসাইন শিবলীর নাম সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে বইটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে তাঁর নামও আলোচনায় এসেছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কোনো বইয়ের সম্পাদক হিসেবে নাম থাকা এবং বইটির প্রতিটি বক্তব্যের রচয়িতা হওয়া এক বিষয় নয়। একইভাবে, সম্পাদকীয় দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বইটির ভেতরের তথ্য, প্রকাশনা-সংক্রান্ত বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বইটির শিরোনাম ও প্রচ্ছদে উল্লিখিত পরিচয় থেকে এর সঙ্গে তাঁর সম্পাদনাগত সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলেও, বইটির প্রতিটি বক্তব্যের দায়, রচনার প্রকৃত বিভাজন কিংবা প্রকাশনার পেছনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলাদা প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ও প্রকাশিত কাজ শাকের হোসাইন শিবলীর লেখালেখির পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুক্তিযুদ্ধে আলেম-উলামাদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর কাজ। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের গ্রন্থাগার ক্যাটালগে তাঁর ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে: একাত্তরের চেপে রাখা ইতিহাস’ বইটির ২০১৪ সালের প্রকাশনা-তথ্য পাওয়া যায়। বইটি আল-এছহাক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এবং এতে ৯১১ পৃষ্ঠার উল্লেখ রয়েছে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারেও তাঁকে ইসলামি সাংবাদিকতা ও ফিচার লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁর সাংবাদিকতা, বই রচনা এবং সম্পাদনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। বিতর্কের প্রেক্ষাপটে কী জানা জরুরি? ‘ফেতনায়ে মামুনিয়্যা’ বইটি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, বইটির লেখক ও সম্পাদক হিসেবে কার কী ভূমিকা, তা নির্ভরযোগ্য প্রকাশনা-তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বইয়ে যেসব বক্তব্য বা অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোকে যাচাইযোগ্য তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ—এই তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নাম বইয়ে উল্লেখ থাকলেই বইটির সঙ্গে তাঁদের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না।
এ প্রসঙ্গে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত একটি সংবাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব ও প্রচার বিভাগের প্রধান শেখ ফজলুল করীম মারুফের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বইটির সঙ্গে দলটির কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন। অতএব, বইটি নিয়ে বিতর্কের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং বইটির মূল বিষয়বস্তু—দুটিই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শাকের হোসাইন শিবলী বাংলাদেশের ইসলামি সাংবাদিকতা ও গ্রন্থ রচনার জগতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একজন সাংবাদিক ও লেখক। মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বই এবং ইসলামি ইতিহাস ও সমকালীন বিষয়ক লেখালেখি তাঁর পরিচয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ। সাম্প্রতিক ‘ফেতনায়ে মামুনিয়্যা’ বইকে ঘিরে নতুন করে তাঁর নাম আলোচনায় এসেছে।